ধারাবাহিক মূল্যায়ন কাকে বলে ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন কৌশল

ধারাবাহিক মূল্যায়ন কাকে বলে ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন কৌশল


নতুন জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলাম ২০২১ এ দুই ধরনের মূল্যালয়ের কথা বলা হয়েছে। এখানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন কী ও কেন এ বিষয়ে কারিকুলাম ২০২১ এ যেভাবে দেওয়া আছে তা তুলে ধরা হলো।

ধারাবাহিক মূল্যায়ন কী ও কেন

ধারাবাহিক মূল্যায়ন শিখন-শেখানো কার্যাবলির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশলের মাধ্যমে শিখন- শেখানো কার্যক্রমের শুরুতে, কার্যক্রম চলাকালীন এবং শেষে শিক্ষার্থীকে মূল্যায়নের প্রক্রিয়াই হলো ধারাবাহিক মূল্যায়ন। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে ও মূল্যবোধকে মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষার্থীর শিখন মূল্যায়ন করে দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ফলাবর্তন ও পুনঃমূল্যায়ন করে শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি নিশ্চিত করা হয় বলে এ ধরনের মূল্যায়নকে শিখনের জন্য মূল্যায়নও বলা হয়ে থাকে। ধারাবাহিক মূল্যায়ন কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন নয়। তাই এই মূল্যায়নের জন্য আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীকে তার শিখনে সহায়তা করা । শিখন-শেখানো কার্যাবলি চলাকালে প্রয়োজনীয় ফলাবর্তনের মাধ্যমে এই শিখন নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক ও আনন্দময় পরিবেশে ধারাবাহিকমূল্যায়ন করবেন।

ধারাবাহিক মূল্যায়নের উদ্দেশ্যসমূহ:

  • ধারাবাহিক মূল্যায়নের প্রধান উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীকে তার শিখনে সহায়তা করা ।
  • শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পরিবীক্ষণ করে শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি বা উন্নয়নের ক্ষেত্র নিরূপণ করা এবং তার প্রতিকার করা।
  • শিক্ষার্থীর চিহ্নিত শিখন ঘাটতি বা উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলো কার্যকর ফলাবর্তন (Feedback) এবং পুনঃমূল্যায়নের মাধ্যমে পূরণ করা।
  • শিক্ষককে তার শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশলের কার্যকারিতা (Effectiveness of teachinglearning strategies) সম্পর্কে ধারণা প্রদান ও তার মানোন্নয়নে সহায়তা করা।

ধারাবাহিক মূল্যায়নের প্রক্রিয়া /ধাপসমূহ:

  • পরিকল্পনা প্রণয়ন
  • মূল্যায়ন কৌশল ও টুলস নির্বাচন
  • মূল্যায়ন পরিচালনা ও তথ্য সংরক্ষণ
  • সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ ও কার্যকর ফলাবর্তন প্রদান।

ধারাবাহিক মূল্যায়নের প্রয়োগ ক্ষেত্রসমূহ বা Domains:

একজন শিক্ষার্থীর শিখন নিশ্চিতকল্পে শিখনের ৩টি ক্ষেত্র বা Domainsযেমন- জ্ঞান ((Cognitive Domain), মনোপেশীজ ((Psychomotor domain) এবং আবেগিক ((Affective Domain) ক্ষেত্রের উপর ভিত্তি করে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের প্রয়োগক্ষেত্র ৩টি যথা- জ্ঞান (Knowledge), দক্ষতা (Skill) এবং দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ ((Attitude and Values)। প্রতিটি প্রয়োগক্ষেত্রের আবার কয়েকটি উপক্ষেত্র রয়েছে। যেমন- জ্ঞান (Knowledge) প্রয়োগক্ষেত্রের উপক্ষেত্র হলো জানা, অনুধাবন ও প্রয়োগ। আবার দক্ষতার উপক্ষেত্রসমূহ হলো সৃজনশীলতা, সু²চিন্তন, যোগাযোগ ও সহযোগিতা। একইভাবে মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি উপক্ষেত্রসমূহের কয়েকটি হলো সহমর্মিতা, পরমতসহিষ্ণুতা, আগ্রহ ও কৌতুহল ইত্যাদি।

ধারাবাহিক মূল্যায়ন কৌশল ও টুলস:

  • মৌখিক প্রশ্নোত্তর
  • লিখিত প্রশ্নোত্তর
  • পর্যবেক্ষণ (একক কাজ, জোড়ায় কাজ, দলগত কাজ, প্রকল্প/ব্যবহারিক কাজ ইত্যাদি)
  • সাক্ষাৎকার
  • স্ব-মূল্যায়ন
  • সতীর্থ / সহপাঠী কর্তৃক মূল্যায়ন

ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি

প্রাথমিক স্তরের বিস্তারিত শিক্ষাক্রমে বিষয়ভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতা, শিখনফল, শিখন-শেখানো কার্যাবলি ও মূল্যায়ন কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষক সহায়িকায় প্রতিটি পিরিয়ডে শিক্ষার্থীদের কাঙ্খিত শিখনফল কতটুকু অর্জিত হয়েছে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য শিখন-শেখানো কার্যাবলির ভিত্তিতে মূল্যায়ন নির্দেশক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষক মূল্যায়ন নির্দেশকের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পাঠে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জ্ঞান (Knowledge), দক্ষতা (Skill), দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের (Attitude and Values) ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর শিখনফল অর্জনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে শিক্ষক ডায়েরি-১ এ মান প্রদান করবেন। যে সকল শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় তাদেরকে প্রয়োজনীয় ফলাবর্তন প্রদান সাপেক্ষে পুনর্মূল্যায়ন করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করতে হবে। উক্ত মূল্যায়ন নির্দেশকের মান শিক্ষক নিজের কাছে সংরক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনে ব্যবহার করবেন। এ মূল্যায়ন নির্দেশকের শিখনফল অর্জনের মান শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের কাছে প্রকাশ করা হবে না। এরপর বিষয়ভিত্তিক ও অধ্যায়ভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা অর্জনের বিবরণী (শিক্ষক ডায়েরী-২) থেকে প্রাপ্ত মান বা ফলাফলের ভিত্তিতে প্রান্তিকের ফলাফল প্রস্তুত করে অর্জিত শিখন অগ্রগতির মাত্রা নির্দেশক অনুসরণ করে শিক্ষার্থীর অবস্থান নির্ধারণ করবেন। শিক্ষক অধ্যায়ভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা অর্জনের বিবরণী (শিক্ষক ডায়েরী-২) থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে যে সকল শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় তাদের নিরাময়মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শিখন অগ্রগতির কাঙ্খিত ধাপে পৌঁছাতে হবে।

পরিশেষে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক/প্রধান শিক্ষক প্রদত্ত রির্পোট কার্ড অনুযায়ী শুধুমাত্র বিষয়ভিত্তিক বর্ণনামূলক বিবরণ লিখবেন। রির্পোট কার্ডে কোনো গ্রেড পয়েন্ট বা শতকরা গড় লেখা যাবে না। ব্যক্তিগত ও সামাজিক গুণাবলির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্রেণিশিক্ষক তার পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থেকে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য যেমন ভালো, কম, গানের প্রতি আগ্রহ আছে ইত্যাদি লিখবেন।

শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়নের নির্দেশনা:

মূল্যায়ন নির্দেশক ছক বা শিক্ষক ডায়েরি-১ ব্যবহার
১.৮.১। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রধান শিক্ষক এনসিটিবি ও ডিপিই এর ওয়েবসাইটে আপলোডকৃত বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন নির্দেশক (শিক্ষক ডায়েরি-১) শিক্ষার্থীর রোল নম্বর, নাম এবং অধ্যায়, পাঠ ও শিখনফলের নম্বর উল্লেখ করে নিজ নিজ বিদ্যালয়ের শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী প্রিন্ট ও বাইন্ডিং করবেন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক শ্রেণি পাঠদানকালে ব্যবহার করবেন। এক্ষেত্রে, শিক্ষক ডায়েরি-১ এর ১টি নমুনা ছক সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন নির্দেশকসমূহের শুধুমাত্র অর্জন উপযোগী যোগ্যতা ও শিখনফলসমূহের নম্বরগুলো শিক্ষক সহায়িকা হতে কপি কওে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যানুযায়ী পৃষ্টা তৈরি করে নিতে হবে।

১.৮.২। প্রধান শিক্ষক একইভাবে প্রতিটি বিষয়ের জন্য শিক্ষার্থীর রোল নম্বর, নাম এবং অধ্যায়, পাঠ ও শিখনফলের নম্বর উল্লেখ করে নিজ নিজ বিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষক ডায়েরি-২ তৈরি করে নিবেন। প্রধান শিক্ষক এই ডায়েরি বিদ্যালয়ে সারা বছর সংরক্ষণ করবেন।

১.৮.৩। প্রতিটি বিষয়ের জন্য ধারাবাহিক মূল্যায়ন সম্পর্কিত নির্দেশকসমূহ মনোযোগ সহকারে পড়বেন। শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য ৩টি ডোমোইন জ্ঞান (Knowledge), দক্ষতা (Skill), দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের (Attitude and Values) জন্য এক বা একাধিক নির্দেশক (Indicator) ব্যবহার করে মূল্যায়ন নির্দেশক তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে শ্রেণিপাঠদানকালে পর্যবেক্ষণ বা বিভিন্ন টুলস/কৌশল ব্যবহার করে মূলায়ন করবেন। শিক্ষক প্রতি শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করার জন্য মূল্যায়ন নির্দেশকে প্রদত্ত নির্দেশকসমূহ আলাদা আলাদা করে মূল্যায়ন করবেন কিন্তু মান প্রদানের সময় শিক্ষক তার নিজস্ব মেধা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী ঐ/সংশ্লিষ্ট পাঠের শিখনফলের জন্য সার্বিকভাবে (Holistically) নির্ধারিত মান ২/১/০ প্রদান করবেন। জ্ঞান, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের জন্য আলাদাভাবে নম্বর দিতে হবে না ; তবে কোন শিক্ষার্থীর কোন ডোমোইনে কোন নির্দেশক পারেনি এমন ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ফলাবর্তন প্রদানের লক্ষ্যে শিক্ষক শিক্ষার্থীর রোল নামের ঘরে উদাহরণস্বরূপ: জ্ঞান (Knowledge) এর জন্য K, দক্ষতা(Skill) এর জন্য
S বা দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের ((Attitude and Values) জন্য A লিখে রাখবেন।

শিক্ষক লক্ষ্য রাখবেন, সাধারণত কোনো শিক্ষার্থীর জ্ঞান (Knowledge) এর ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে ঐ শিক্ষার্থী দক্ষতার (Skill) ক্ষেত্রেও দূর্বলতা থেকে যাবে। আবার জ্ঞান (Knowledge) ও দক্ষতা (Skill) এর ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলেও ঐ শিক্ষার্থী (Attitude and Values) এর ক্ষেত্রে দুর্বলতা নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জ্ঞান (Knowledge) ও দক্ষতা (Skill) পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত।

আরো পড়ুনঃ 
  • সামষ্টিক মূল্যায়ন পদ্ধতি
  • ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের পার্থক্য
  • মূল্যায়ন এর প্রকারভেদ
  • ধারাবাহিক মূল্যায়ন প্রশিক্ষণ
  • ধারাবাহিক মূল্যায়ন সুবিধা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন